প্রথম আলো বিজ্ঞান উৎসবে রাইসা আফরিন

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। একটি জাতির উন্নয়নের প্রথম উপকরণ হলো শিক্ষা। শিক্ষাই দেশকে দারিদ্রমুক্ত করতে পারে। আর শিক্ষা গ্রহণের জন্য নির্ধারিত বিষয়গুলির মধ্যে বিদ্যালয় অন্যতম। বলতে গেলে বিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষাগ্রহণের উৎকৃষ্ট এবং উত্তম স্থান। একটি শিশু জন্মের পর তার পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা লাভ করে কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি তার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও কৌতূহল জাগতে থাকে। নির্দিষ্ট বয়স সীমা অতিক্রম করার পর তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। বিদ্যালয় হল শিশু-কিশোরদের মিলনায়তন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় এমন কিছু কথা বা ঘটনা থাকে যেগুলো আমরা চাইলেও কোনদিন ভুলতে পারবো না।
আমি এখন দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। কয়েক মাস পরেই আমার এসএসসি পরীক্ষা কাজেই মাথায় পড়াশোনার ভীষণ চাপ কয়েক মাস বাদেই আমরা দশম শ্রেণীর পরীক্ষার্থীরা বিদায় নিতে চলেছি চাইলেও তার স্মৃতি পরিপূর্ণ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে আসতে পারবো না ভেবে খুব খারাপ লাগছে।

যাহোক বিদ্যালয় অধ্যায়নকালে এই ৫ বছরে বিভিন্ন জায়গায় যাবার সুযোগ পেয়েছি। বার্ষিক বনভোজনের পাশাপাশি প্রায় প্রতিবছর ছোটখাটো একটা বিজ্ঞানমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। অংশগ্রহণ ও করি অগ্রহসহকারে। আমার মতে জেতাটা বড় ব্যাপার নয়, অংশগ্রহণ করাটাই বড় কথা।

এমনি এক সুবর্ণ সুযোগ এলো আমাদের হাতে। ভাবলাম এই শেষ সুযোগ, স্কুলে থাকাকালীন হয়তো এইরকমভাবে কোন কিছুতে অংশগ্রহণের সুযোগ আর পাবো না। তাই স্বচ্ছন্দ চিত্তে তালিকায় নাম দিয়ে দিলাম। রাজশাহী কলেজে অনুষ্ঠিত হবে এই অনুষ্ঠানটি নাম বিজ্ঞান উৎসব। আমাদের বিদ্যালয় থেকে 18 জনকে একটা সাময়িক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করা হলো। আমি অবশ্য পরীক্ষা দেই নি সেদিন স্কুলে আসেনি তবুও প্রিন্সিপাল স্যারকে বলে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করিয়ে নিয়েছি।

যাহোক ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শুক্রবার আমরা ভোর পাঁচটায় বাসা থেকে স্কুল মাঠে উপস্থিত হলাম। মাঠে গিয়ে দেখি একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে দুই জন শিক্ষককে নিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। ৫:৩০ এ বাস চললো সবকিছু কে পিছনে ফেলে সুযোগে ছুটে চলল বাস।পথে আরও তিনটা স্কুলের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদেরকে তোলা হলো আমাদের বসে।

মনে হলো সবাই মিলে যেন একটা বনভোজনের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। যদিও সেখানে ৮:৩০ এর মধ্যে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হয়েছিল তবুও আমাদের পৌঁছাতে একটু দেরী হল। গিয়ে দেখি কলেজ প্রাঙ্গণে প্রায় সব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়েছে। লম্বা লাইন করে সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমরাও যোগদান করলাম।
রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাস প্রাঙ্গনে
 রাজশাহী কলেজের মাননীয় অধ্যক্ষ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বর্গের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এবং পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হলো। এরপর সুশৃংখলভাবে কুইজ এবং প্রোজেক্টের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কে আলাদা করে পৃথক পৃথক কক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমরা গেলাম কলাভবনে। পরীক্ষা কেমন দিলাম প্রথমে বুঝতে পারিনি। তবে পরীক্ষা যে খুব একটা খারাপ দেয়নি তার কিছুক্ষণ পরেই জানতে পারলাম। যাহোক সেগুলা পরের কথা, কলা ভবন থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম অডিটরিয়ামে। সেখানে গিয়ে দেখি সবাই নিজ নিজ প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত।

অভিভূত হলাম এক একজনের উদ্ভাবনী প্রকল্প না শক্তি দেখে। আমাদের বিদ্যালয় থেকেও একটা প্রজেক্ট ছিল। তাই এক সপ্তাহব্যাপী খাটাখাটনি করে প্রজেক্ট তৈরি করতে হয়েছিল। আমাদের প্রজেক্ট এর নাম ছিল টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন। পরিকল্পনায় ছিল সাদিয়া ঈশ্রত তুরজাউন। তাছাড়া অন্যরাও সাহায্য করেছে।

যাহোক, পরিদর্শকরা সবার প্রজেক্ট দেখলো এবং সে সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে চাইল। এসবের পাশাপাশি আবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। নাচ-গান ম্যাজিকে চারদিক মুখরিত হয়ে গেছিল। এসব দেখার পর আমরা কয়েকজন মিলে কলেজ টা একটু ঘুরতে গেলাম। যা দেখলাম তাতে মনে হলো কলেজ টা বেশ প্রাচীন স্থাপিত হয় ১৮৭৩ সালে কিন্তু পুরো কলেজ টা ভালো করে ঘোরার আগেই আমার ডাক পড়ে গেল। শুনলাম যে আমি নাকি সিলেক্টেড হয়ে গেছি।

আমার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হতে লাগল। সত্যিই এটি আমার কাছে একটি বড় অর্জন। মঞ্চে উঠে স্যারদের সাথে কয়েকটা ছবি তুললাম। আমার অর্জন হলো একটি টি-শার্ট, অভিনন্দনপত্র, জাতীয় পর্যায়ে যাবার পর আর একটা মেডেল। তারপর আমরা সবাই নিচ তলায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
অধ্যক্ষের সাথে পুরস্কার হাতে লেখিকা
তখন দুপুর হয়ে গেছে শিক্ষকরা বললেন যে, দুপুরের খাবারের জন্য আমাদের হোটেলে যেতে হবে। হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে কলেজ ক্যাম্পাসে একটু ঘুরাঘুরি করলাম। তারপর আবার বাসে উঠলাম। কয়েক কিলোমিটার যাবার পর শিক্ষকরা আমাদের পদ্মার পাড় নিয়ে গেলেন সেখানকার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ মৃদুমন্দ বাতাস এবং প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখে প্রাণটা ভরে গেল। নদীর এপার থেকে ওপার ঠিক মত দেখা যায়না নদীর পাড়ে সাদা সাদা কাশফুল ফুটে আছে।

প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা বের হবার পর আমরা সবাই আবার বাসে উঠলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই বৃষ্টি শুরু হল বেশ খানিকক্ষণ পর অবশেষে বৃষ্টি থামল। এদিকে বাসে সবাই হইহুল্লোর শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা কেউ গান বলছে কেউ গল্প করছে কেউবা আবার অভিনয় করছে। বলতে গেলে বাসের মধ্যে একটা আড্ডা জমে উঠল। 

বাড়ি যতই কাছে আসতে শুরু করলো মনে হলো ততোবারই ফিরে ফিরে যাই। কিন্তু ফিরে যাবার উপায় নেই বাড়ি যেতেই হবে। রাস্তায় মাঝে মাঝে বাস থামিয়ে তিনটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা নামল। আমাদের স্কুলের সবার আগে আমি নামলাম তারপর বাড়ি এসে ড্রেস পাল্টাই ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যে ভোরের আলো ফুটেছে বুঝতে পারেনি।

এভাবেই অর্জন করলাম আবার এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা। ইতিহাসের পাতায় না হোক আমার জীবনের ইতিহাসের চিরকাল অম্লান ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
মোসা: রাইসা আফরিন
দশম শ্রেণী, বাঙ্গাবাড়ী ইউনূস স্মরণী স্কুল ও কলেজ

Comments